দেশে দেশে হিন্দুধর্ম

সিঙ্গাপুরে হিন্দু ধর্মের এতো শক্তিশালী অবস্থানের প্রকৃত কারণ কী!

সিঙ্গাপুরে হিন্দু ধর্ম

সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্র। “সিঙ্গাপুর” নামটি এসেছে মালয় ভাষার সিঙ্গাপুরা থেকে। সিঙ্গাপুরা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ “সিঁহাপুরা” থেকে, যার বাংলা অর্থ সিংহপুর।

সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণতম প্রান্তে, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। সিঙ্গাপুরের স্থলভূমির মোট আয়তন ৬৯৯ বর্গকিলোমিটার। এটি মালয়েশিয়া থেকে জোহর প্রণালী এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর প্রণালী দ্বারা বিচ্ছিন্ন।

২০১৮ সালের শুমারী অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম ধনী এই দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫৭ লক্ষ। বৌদ্ধ ধর্ম সিঙ্গাপুরের প্রধান ধর্ম। মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। সিঙ্গাপুরের অন্যান্য ধর্মগুলো হলো খ্রিস্টান, হিন্দু, ইসলাম এবং তাও। সিঙ্গাপুরে বর্তমানে প্রায় তিন লক্ষ সনাতন হিন্দু ধর্মানুসারী বসবাস করে। যা মোট জনসংখ্যার ৫.২ শতাংশ।

আরো পড়ুনঃ মুসলিম দেশ মালয়েশিয়ায় হিন্দুধর্মের হাজার বছরের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস

খ্রিষ্টীয় ৭ম শতকে, যখন তেমাসেক, শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের একটি বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল, তখন থেকেই সিঙ্গাপুরে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। এর প্রায় হাজার বছর পর ব্রিটিশ সরকারের হাত ধরে দক্ষিণ ভারত থেকে বিশাল সংখ্যক অভিবাসী, শ্রমিক হিসেবে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। আর তাদের সাথে সিঙ্গাপুরে আরও বৃহৎ আকারে বিস্তার ঘটে সনাতন হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির। এছাড়া সিঙ্গাপুরে স্বল্পসংখ্যক অ-ভারতীয় হিন্দু রয়েছে। বহুসংখ্যক চিনা বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরিয়ান নারী বিবাহসূত্রে হিন্দুধর্ম অনুসরণ করে থাকে।

সিঙ্গাপুর-হিন্দু
থাইপুসাম উৎসব, সিঙ্গাপুর

দিওয়ালী সিঙ্গাপুরের হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই দিনটি সিঙ্গাপুরে পাবলিক হলি ডে। এছাড়া সিঙ্গাপুরের হিন্দুদের অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, হোলি, থাইপুসাম, পোঙ্গল প্রভৃতি। সনাতন ধর্মানুসারীদের পাশাপাশি কিছু সংখ্যক চিনা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীও হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্টানে অংশগ্রহণ করে এবং হিন্দু মন্দিরগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করে থাকে। চীনা বৌদ্ধ কর্তৃক সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে বড় হিন্দু মন্দির হচ্ছে, ওয়াটার লু স্ট্রীটে অবস্থিত শ্রী কৃষ্ণান মন্দিরটি।

সিঙ্গাপুরে বর্তমানে প্রায় ৪০টির মতো হিন্দু মন্দির রয়েছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল হেরিটেজ বোর্ড তিনটি হিন্দু মন্দিরকে সিঙ্গাপুরের জাতীয় স্মৃতিসৌধ হিসেবে গেজেটভুক্ত করেছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে শ্রী থেন্দায়ু থাপানি মন্দিরকে সিঙ্গাপুরের জাতীয় স্মৃতিসৌধের তালিকায় যুক্ত করা হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধভুক্ত অন্য দুটি মন্দির হচ্ছে শ্রী মারিয়াম্মান মন্দির এবং শ্রী শ্রীনিবাস পেরুমাল মন্দির। যেহেতু সিঙ্গাপুরের হিন্দুদের বেশীরভাগই দক্ষিণ ভারতীয় বংশোদ্ভূত, সেহেতু সিঙ্গাপুরের হিন্দু মন্দিরগুলোতে দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্যরীতি পরিলক্ষিত হয়।

সিঙ্গাপুরের হিন্দু জনসংখ্যা
শ্রী থেন্দায়ু থাপানি মন্দির, সিঙ্গাপুর

আরো পড়ুনঃ এক কালের হিন্দু দেশ আফগানিস্তানে বর্তমানে কী হিন্দু আছে?

এছাড়া সিঙ্গাপুরের ভিন্ন ভিন্ন হিন্দু কমিউনিটি তাদের নিজস্ব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছে। যেমন শ্রীলংকান তামিল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শ্রী সেনপাগা বিনয়াগর মন্দির, চেতিয়ার কমিউনিটি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শ্রী থেন্দায়ু থাপানি মন্দির এবং উত্তর ভারতীয় হিন্দু কর্তৃক, উত্তর ভারতীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির উল্লেখযোগ্য।

সিঙ্গাপুরের অন্যান্য হিন্দু মন্দিরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, শ্রী লায়ান সিথি বিনয়াগর মন্দির, শ্রী আরাশকেশরী শিব মন্দির, শ্রী শিব দুর্গা মন্দির, শ্রী মহা মারিয়াম্মান মন্দির, শ্রী বিরামা কালীয়াম্মান মন্দির, শ্রী আরুলমিগু মুরুগান মন্দির, শ্রী হলি ট্রি বালাসুব্রমানিয়াম মন্দির, বিএপিএস স্বামী নারায়ণ মন্দির, শ্রীকৃষ্ণ মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মন্দির প্রভৃতি।

সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুরের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট দেবান নায়ার চেঙ্গারা ভিতিল

দুটি সরকারী সংস্থা “দ্য হিন্দু এনডোমেন্টস বোর্ড” ও “দ্য হিন্দু এডভাইজরি বোর্ড” সিঙ্গাপুরের হিন্দুদের যাবতীয় বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করে।

সিঙ্গাপুরের রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সিঙ্গাপুরের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন দেবান নায়ার চেঙ্গারা ভিতিল। তিনি ছিলেন কেরল বংশোদ্ভূত হিন্দু। তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আরো পড়ুনঃ বৌদ্ধ প্রধান মিয়ানমারে হিন্দুরা যেভাবে এখনো টিকে আছে

সিঙ্গাপুরের ৬ষ্ঠ প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেল্লাপান রামনাথন। তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখন পর্যন্ত তিনি হলেন সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী প্রেসিডেন্ট।

বর্তমানেও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হিন্দুরা। এছাড়া সিঙ্গাপুরের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে প্রতিনিধিত্ব করছেন হিন্দুরা।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
error: Content is protected !!